শীতের দেখা এখনো মেলেনি। তবে শীতের আগমনী বার্তা যেন আগেই পৌঁছে গেছে কুড়িগ্রামের মাঠে। ভোরের আলো ফুটতেই কাঁধে কোদাল, হাতে সার ও সেচের সরঞ্জাম নিয়ে জমিতে ছুটছেন কৃষকেরা। কেউ মাটির পরিচর্যায় ব্যস্ত, কেউ সার দিচ্ছেন, কেউ সেচ দিচ্ছেন, আবার কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন। কোথাও মাথা তুলেছে মুলার চারা, কোথাও বেড়ে উঠছে ফুলকপি-বাঁধাকপি। লাউ, বেগুনসহ নানা সবজির সবুজে বদলে যাচ্ছে মাঠের চেহারা।
লক্ষ্য একটাই-শীত পুরোপুরি নামার আগেই বাজারে সবজি তুলে ভালো দাম পাওয়া।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠে দেখা গেছে, আগাম শীতকালীন সবজি চাষ ঘিরে কৃষকদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত জমিতে চলছে পরিচর্যার কাজ। অনেক কৃষক নিজেরাই মাঠে কাজ করছেন। আবার কোথাও শ্রমিক নিয়ে চলছে জমি প্রস্তুত ও পরিচর্যা।
কৃষকেরা বলছেন, আগাম সবজি চাষে সাধারণ সময়ের তুলনায় খরচ যেমন বেশি, তেমনি পরিশ্রমও বেশি। জমি প্রস্তুত করা, বীজ বপন, সার ও সেচ দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ-সবকিছুতেই বাড়তি নজর রাখতে হয়। তারপরও মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজির দাম ভালো পাওয়ার আশায় আগাম চাষে ঝুঁকছেন তারা।
ছিনাই ইউনিয়নের কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আগাম সবজি করতে হলে জমিতে বেশি সময় দিতে হয়। সার, সেচ ও শ্রমিকের খরচও বেশি পড়ে। তবে শীতের শুরুতে বাজারে সবজির দাম ভালো থাকে। তাই বেশি পরিশ্রম হলেও আগাম সবজি করছি।’
আরেক কৃষক মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে সবজির চাহিদা বেশি থাকে। তখন দামও ভালো পাওয়া যায়। গত বছর আগাম সবজি করে লাভ হয়েছিল। তাই এবারও বেশি জমিতে আগাম সবজি করেছি।’
তবে আগাম সবজি চাষে লাভের পাশাপাশি রয়েছে ঝুঁকিও। কৃষকদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা আবহাওয়া নিয়ে। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে জমিতে পানি জমে কোমল চারা নষ্ট হতে পারে। আবার শীতের আগে অতিরিক্ত গরম থাকলেও অনেক সবজির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর কুড়িগ্রাম জেলায় প্রায় দুই হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে আগাম শাক-সবজি চাষ হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকেরা জমির ধরন, আবহাওয়া ও বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করছেন।
রাজারহাট উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাসেল মিয়া বলেন, ‘কৃষকেরা আগাম শীতকালীন সবজি চাষে বেশ আগ্রহী। তাদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কোন সবজিতে কী পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে হবে, কখন সেচ দিতে হবে এবং রোগবালাই দেখা দিলে কী ব্যবস্থা নিতে হবে-এসব বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
শীত আসার আগেই তাই কুড়িগ্রামের মাঠে এখন সবুজের ব্যস্ততা। কৃষকের ঘাম ঝরছে জমিতে, আর সেই ঘামের ফসল কখন বাজারে উঠবে-সেদিকেই তাকিয়ে আছে তাদের চোখ। প্রকৃতি সহায় হলে আগাম সবজির ফলন ও বাজারদর-দুই-ই কৃষকের মুখে হাসি ফোটাবে, এমন প্রত্যাশাই এখন মাঠজুড়ে।






