অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্না খাবারে মিলল বিষাক্ত সিসা

স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্না করা খাবারে বিষাক্ত ধাতু সিসা মিশে যেতে পারে। বিশেষ করে একটি নতুন পাত্রের প্রথম কয়েকবারের ব্যবহারে সিসার মাত্রা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিসাধন করতে পারে। গবেষকেরা রান্নার জন্য নিরাপদ পাত্র তৈরিতে সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।

আইসিডিডিআর,বি এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নতুন গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। নেচার পাবলিশিং গ্রুপের ‘জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি’-তে এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে খাবারে কী পরিমাণ সিসা এবং অম্লতা (অ্যাসিডিটি) স্থানান্তরিত হয়, পরিষ্কার করার ধরন ও রান্নার অভ্যাসের কারণে এতে কী পরিবর্তন আসে, তা পরিমাপ করা। বাংলাদেশের গ্রামীণ শিশুদের স্বাভাবিক ভাত খাওয়ার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা অনুমান করেছেন, এ ধরনের পাত্রে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশুর শরীরে খাবার থেকে আসা দৈনিক সিসার পরিমাণ এফডিএ-এর নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৫ গুণেরও বেশি হতে পারে।

আইসিডিডিআর,বির এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ বিভাগের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ড. মাহবুবুর রহমান  বলেন, ‘আমরা বিএসটিআই ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানাই যেন তারা রান্নার পাত্রের ক্ষেত্রে সিসাবিষয়ক সুস্পষ্ট নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এ ছাড়া বাজারে এসব পাত্র বিক্রির ক্ষেত্রে নজরদারি জোরদার করে। সাশ্রয়ী মূল্যের রান্নার পাত্রগুলোও নিরাপদ হওয়া উচিত। উন্নত উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং কার্যকর তদারকির মাধ্যমে পরিবারগুলো যাতে সিসার ঝুঁকি ছাড়াই তাদের দৈনন্দিন খাবার প্রস্তুত করতে পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।’

গবেষকেরা মানহীন ভাঙারি ধাতু (স্ক্র্যাপ মেটাল) থেকে তৈরি রান্নার পাত্রের ঝুঁকি তুলে ধরেছেন এবং নিরাপদ উৎপাদন, পরীক্ষা ও গৃহস্থালির কাজে সতর্কতার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্রের বদলে কিংবা পুরোনো কাপড়ের বিনিময়ে নতুন হাঁড়িপাতিল নেওয়া একটি পরিচিত দৃশ্য। এই গবেষণায় সরাসরি এসব বিনিময়ের ওপর নজর দেওয়া না হলেও গবেষণার ফলাফল থেকে স্পষ্ট যে একটি পাত্রের নতুনত্ব বা চাকচিক্য কখনোই তার নিরাপত্তার প্রমাণ নয়। স্থানীয়ভাবে তৈরি বহু হাঁড়িপাতিল ভাঙারি ধাতু গলিয়ে তৈরি করা হয়। কোনো যাচাইবাছাই ছাড়া এসব স্ক্র্যাপ ধাতু ব্যবহারের কারণে তৈরি পাত্রে ক্ষতিকর সিসা চলে আসতে পারে। সিসা শিশুদের শেখার ক্ষমতা ও আচরণে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে, এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে রক্তে সিসার উপস্থিতির কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই।

গবেষকেরা স্থানীয় বাড়িঘর থেকে সংগৃহীত ৭টি ব্যবহৃত পাত্র এবং একজন সরবরাহকারীর কাছ থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র পরীক্ষা করেন। প্রথমে তারা প্রতিটি পাত্রের ধাতুতে কী পরিমাণ সিসা রয়েছে তা নির্ণয় করেন। এরপর পাত্রগুলোতে তাপ দিয়ে সাধারণ সাদা ভাত এবং ডাল-চালের খিচুড়ি রান্না করা হয়। সবশেষে রান্না করা খাবার ও তরলে সিসার পরিমাণ পরিমাপ করা হয়। পাত্র এবং তাতে রান্না করা খাবার-উভয় ক্ষেত্রেই গবেষকেরা সিসার মাত্রা পরিমাপ করেছেন, যাতে স্পষ্ট বোঝা যায় কীভাবে একটি নিত্যদিনের রান্নার পাত্র সিসা সংক্রমণের উৎস হয়ে দাঁড়ায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন বা পুরোনো-পরীক্ষা করা প্রতিটি পাত্র থেকেই সিসার নির্গমন ঘটেছে। নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্নার ক্ষেত্রে প্রতি কেজি ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং প্রতি কেজি খিচুড়িতে সর্বোচ্চ ৪২০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত সিসা পাওয়া গেছে। তুলনামূলকভাবে, নবজাতক ও ছোট শিশুদের খাবারের জন্য মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নির্ধারিত সর্বোচ্চ নিরাপদ সিমা হলো প্রতি কেজিতে মাত্র ১০ মাইক্রোগ্রাম। বারবার ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে সিসার নির্গমন কিছুটা কমলেও তৃতীয়বার রান্নার সময়ও এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি সাতটি ব্যবহৃত পাত্রের মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। একটি পাত্র কীভাবে ব্যবহার ও পরিষ্কার করা হচ্ছে, তার ওপরও সিসা নির্গমনের মাত্রা নির্ভর করে। নতুন পাত্র স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে তা না ঘষার তুলনায় প্রায় ৫ গুণ বেশি সিসা নির্গমন করে। পাশাপাশি রান্নার সময় ধাতব খুন্তি দিয়ে নাড়াচাড়া করলেও সিসার নির্গমন বেড়ে যায়।

গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, কারিগরি দিক থেকে অত্যন্ত নিখুঁত হলেও এটি ছিল একটি স্বল্পপরিসরের ল্যাবরেটরি গবেষণা। শিশুদের সিসা গ্রহণের এই হিসাবটি সরাসরি শিশুদের শরীর থেকে পরিমাপ না করে একটি গাণিতিক মডেলের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই অন্যান্য রান্নার পাত্র এবং দৈনন্দিন রান্নার অভ্যাসের ওপর আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

  • Related Posts

    জীবনসঙ্গীর মধ্যে যে পাঁচ গুণ চান সাই পল্লবী

    পর্দায় ‘রামায়ণ’ মহাকাব্যের নায়ক রামের সঙ্গী সীতা। তবে বাস্তব জীবনে নিজের জীবনসঙ্গী কেমন চান দক্ষিণী অভিনেত্রী সাই পল্লবী? সম্প্রতি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র মঞ্চে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন অভিনেত্রী।…

    সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সব ম্যাচ দেখা যাবে টি স্পোর্টস-এ

    ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ দিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবলের ১৫তম আসরের পর্দা উঠবে আগামীকাল (৫ নভেম্বর)। উদ্বোধনী দিনে স্বাগতিক বাংলাদেশও খেলতে নামবে। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে টুর্নামেন্টের…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    জীবনসঙ্গীর মধ্যে যে পাঁচ গুণ চান সাই পল্লবী

    জীবনসঙ্গীর মধ্যে যে পাঁচ গুণ চান সাই পল্লবী

    সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সব ম্যাচ দেখা যাবে টি স্পোর্টস-এ

    সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সব ম্যাচ দেখা যাবে টি স্পোর্টস-এ

    রোনালদোর বিদায়ে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পর্তুগাল

    রোনালদোর বিদায়ে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পর্তুগাল

    স্ত্রীসহ শ্বশুরবাড়ির ৬ সদস্যকে হত্যার পর শহরে ছড়িয়ে দিলেন লাশের টুকরো!

    স্ত্রীসহ শ্বশুরবাড়ির ৬ সদস্যকে হত্যার পর শহরে ছড়িয়ে দিলেন লাশের টুকরো!

    অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্না খাবারে মিলল বিষাক্ত সিসা

    অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্না খাবারে মিলল বিষাক্ত সিসা

    আরও ৩ রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করল চীন

    আরও ৩ রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করল চীন