বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল চলতি সপ্তাহে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। সামুদ্রিক নজরদারি প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাপলার’-এর সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি দিয়ে মাত্র ৩৩টি জাহাজ অতিক্রম করেছে, যা ঠিক এক সপ্তাহ আগের একই সময়ে ছিল ৫০টি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করায় মূল পথটিতে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই পানিপথটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে ইরান ও ওমানের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, তা থেকে ইতিবাচক ফলাফলের অপেক্ষায় উদ্বেগের সঙ্গে চোখ রাখছে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজার।
ক্যাপলার-এর সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, গত বৃহস্পতিবার মাত্র চারটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে। যার মধ্যে অন্যতম ছিল ২ মিলিয়ন বা প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল ইরাকি ‘বসরা ক্রুড’ বহনে সক্ষম বিশাল আকারের একটি তেলবাহী জাহাজ ‘নিসোস কিয়া’। বাদবাকি তিনটির মধ্যে দুটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) পরিবাহী জাহাজ এবং একটি সাধারণ ছোট পণ্যবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার ছিল। এ ছাড়া চলতি সপ্তাহে এখন পর্যন্ত মাত্র ৬টি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার প্রণালিটি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। বিপরীতে এ পর্যন্ত মোট ২১টি জাহাজ এতে প্রবেশ করেছে, যার বেশির ভাগই ব্যবহার করেছে ইরানি বাণিজ্যিক পথটি।
যুদ্ধাবস্থার মধ্যে জাহাজসংকট তৈরি হলেও ইরাকের ‘বসরা অয়েল টার্মিনাল’ থেকে অপরিশোধিত তেল ক্রয়ের বিশাল সুযোগ কাজে লাগাতে বেশ সচেষ্ট ছিল এশিয়ার শক্তিশালী অর্থনীতির দুই দেশ চীন ও ভারতের কয়েকটি তেল শোধনকারী প্রতিষ্ঠান। শিপিং সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ভারী ও মাঝারি বসরা ক্রুডের ওপর প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৩০ ডলার পর্যন্ত ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছিল ইরাকের রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন সংস্থা ‘সোমো’। আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের তুলনায় রেকর্ড এই মূল্যছাড়ে আকৃষ্ট হয়ে চলতি সপ্তাহে চীনা ও ভারতীয় শোধনাগারগুলো ইরাকের টার্মিনাল থেকে তেল আনার উদ্দেশ্যে জাহাজ ভাড়া করার চেষ্টা চালায়। তবে নিরাপত্তাঝুঁকি ও যুদ্ধের আশঙ্কায় কোনো জাহাজ মালিকই প্রণালিটিতে প্রবেশে সম্মতি না দেওয়ায় চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
যুদ্ধ শুরুর আগে স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ যাতায়াত করত, যা এখন নেমে এসেছে তলানিতে। অচলাবস্থা নিরসনে উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর তেহরানকে তদারকির কর্তৃত্ব দিয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য চুক্তির কথা উঠলেও জ্বালানি খাতের অভিজ্ঞরা বিষয়টি বাস্তবায়নে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছেন। শিল্প খাতের নির্ভরযোগ্য সূত্রের মতে, মার্কিন সরকারের কঠোর অর্থায়ন নিষেধাজ্ঞা এবং জাহাজের বিমা-সংক্রান্ত জটিল শর্তাবলির কারণে ওমান-ইরান চুক্তির প্রয়োগ বাস্তবক্ষেত্রে মোটেও সহজসাধ্য নয়।
হরমুজ প্রণালিতে যখন এ ধরনের চরম মন্দা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, ঠিক সেই সময়ে লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক চলাচলে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। ক্যাপলার-এর তথ্যমতে, গত বুধবার যেখানে ১৯টি জাহাজ বাব আল-মানদেব প্রণালি অতিক্রম করেছিল, বৃহস্পতিবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬টিতে। অপরদিকে নিজস্ব ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ও স্বতন্ত্র পদ্ধতি ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক তথ্য সংস্থা ‘এলএসইজি’ বৃহস্পতিবার ওই একই পথ দিয়ে ২৮টি জাহাজ চলাচলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
সূত্র: রয়টার্স







