জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বড় প্রভাব পড়েছে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়ায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-বেনাপোল, চট্টগ্রাম-উত্তরাঞ্চল ও চট্টগ্রাম-কুমিল্লাসহ বিভিন্ন রুটে বাণিজ্যিক যানবাহনের ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরপরই ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিকরা দফায় দফায় ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যা প্রায় দ্বিগুণ। অতিরিক্ত এই পরিবহণ ব্যয়ের প্রত্যক্ষ চাপ গিয়ে পড়ছে ভোগ্যপণ্যের ওপর; যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চাল ও শাকসবজির পাইকারি বাজারে।
মালিক-শ্রমিকদের দাবি, সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় বাধ্য হয়েই তাদের ভাড়া বাড়াতে হয়েছে। এর ফলে চাল, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্যের দামের ওপর বাড়তি প্রভাব পড়ছে। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তেলের মূল্যবৃদ্ধির অনুপাতের চেয়ে অনেক বেশি হারে ভাড়া হাঁকাচ্ছেন মালিক ও শ্রমিকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি পণ্য আসে। বন্দর থেকে সড়কপথেই তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর চাহিদামতো ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মিলছে না। গাড়ি সংকটের এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন মালিক ও শ্রমিকরা।
রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, নাটোর ও নওগাঁসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন মোকামে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্য পরিবহণে চট্টগ্রাম থেকে আগে যেখানে ট্রাকভাড়া ছিল ২২ হাজার থেকে ২৪ হাজার টাকা, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকায়। ট্রাকভাড়া বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাবে প্রতি বস্তা চালের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে; কিছু জাতের চালে তা আরও বেশি।
পাহাড়তলী ও চাক্তাইয়ের একাধিক চাল ব্যবসায়ী জানান, ঢাকার বিভিন্ন গুদাম থেকে চট্টগ্রামে এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় চাল পরিবহণ করতে ট্রাকভাড়া বাবদ আগে খরচ হতো ১৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সেই ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ২৫ হাজার থেকে ২৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি ট্রাকে ভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত।
একইভাবে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে চট্টগ্রামে চাল, শাকসবজি, আলু, কলাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য পরিবহণে যে ট্রাকের ভাড়া ছিল ২২ হাজার থেকে ২৪ হাজার টাকা, জ্বালানি তেলের সংকটকে পুঁজি করে এখন সেই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৪০ হাজার থেকে ৪২ হাজার টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রতি ট্রিপে উত্তরবঙ্গ থেকে চট্টগ্রামে ট্রাকভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণের মতো। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে আশুগঞ্জ ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় চাল পরিবহণে ট্রাকভাড়া আগে ছিল ১৪ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা; যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার থেকে ২৩ হাজার টাকায়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও টেকনাফ রুটেও দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করা হচ্ছে।
আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের মতে, মোকামে চালের দাম না বাড়লেও শুধু ট্রাকভাড়ার কারণে বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা বা তারও বেশি দাম বেড়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য খরচও বেড়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে সবজির বাজারও বেশ চড়া; কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি মিলছে না।
জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে স্বাভাবিক সময়ে ১৪ টনের কাভার্ডভ্যানের গড় ভাড়া থাকে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং ২৪ টনের গাড়ির ভাড়া ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। ট্রাক ও কনটেইনারবাহী ট্রেইলরের ভাড়াও পণ্যের ওজনের সঙ্গে মিল রেখে নির্ধারিত হয়; কিন্তু জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর ট্রেইলর ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়াও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেয় সরকার। নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
চাল আমদানিকারক নুরুল আলম জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে পণ্য পরিবহণে। উত্তরবঙ্গের মোকামগুলো থেকে পণ্য আনতে আগে যে ভাড়া গুনতে হতো, এখন তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দাবি করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে চালসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম আরও বেড়ে যাবে।
ঢাকার আশুলিয়া ইপিজেড থেকে তৈরি পোশাক নিয়ে চট্টগ্রামে আসা কাভার্ডভ্যানচালক কামাল হোসেন বলেন, স্বাভাবিক সময়ে এই গাড়ির ভাড়া ছিল ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। তেলের দাম বাড়ার কারণে সেই ভাড়া এখন ৩০ হাজার টাকার কাছাকাছি নেওয়া হচ্ছে; কিন্তু তেলের বাড়তি খরচের কারণে এতে আমাদের পোষায় না।






