পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে আকাশে উড়ানো হয়েছে নানা রঙের ফানুস। সোমবার সন্ধ্যার পর উপজেলার বিভিন্ন রাখাইন পল্লী থেকে একে একে উড়তে শুরু করে এসব ফানুস। এতে আলোকিত হয়ে ওঠে উপকূলের আকাশ।
দূর থেকে তাকালে মনে হয়, আকাশজুড়ে যেন তারার মেলা বসেছে, মিটমিট করে জ্বলছে অসংখ্য তারা। এর মধ্যে আরা দু-একটি খসে পড়ার দৃশ্যও চোখে পড়েছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তাদের ভাষ্যমতে, প্রবারণা পূর্ণিমা উৎসব উপলক্ষে প্রায় ১ হাজার ফনুস অকাশে উড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ফানুসটির উচ্চতা ছিলো ৪২ ফুট। এছাড়া সাধারনত ৩৬ ফুট ও ১২ ফুট উচ্চতার ফানুস বেশি ছিলো। বাঁশের কঞ্চি ও রংবেরঙের কাগজ দিয়ে এসব ফানুস তৈরি করতে তাঁদের সময় লেগেছে প্রায় এক মাস।
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিবছরই প্রবারণা পূর্ণিমায় উৎসবে ফানুস উড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে গৌতম বুদ্ধকে স্মরণ করেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা। এ বছরও এর ব্যতিক্রম নয়, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য আর উৎসবের আনন্দে প্রবারণা পূর্ণিমা হয়ে ওঠে সমুদ্র উপকূলী রাখাইন সম্প্রদায়ের মিলনমেলা। প্রতিটি বৌদ্ধবিহার সাজানো হয় বর্ণিল আলোকসজ্জায়। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজনকে আতিথেয়তায় পরিবেশন করেন বিন্নি চালের হরেক রকম পিঠা পুলি। তবে সন্ধ্যার পর আকাশজুড়ে রঙিন ফানুসের বিচরণ যেন আনন্দে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। ফানুস উড়ানোর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ রাখাইন পল্লীর আশপাশে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পল্লীগুলোতে জোরদার করা হয় নিরাপত্তাব্যবস্থা।
রাখাইন যুবক অংছেওয়ন বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমা উৎসব উপলক্ষে তাঁরা ৮০টি ফানুস তৈরি করেছেন। এসব ফানুস সোমবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একে একে উড়ানো হয়েছে।
অপর রাখাইন যুবক মংচো বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে রাখাইন পল্লির প্রতিটি ঘরে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে নানা আয়োজনে মেতেছেন রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ। রাতের আকাশে সারি সারি আলোকিত ফানুসের দৃশ্য উৎসবের আনন্দকে আরও বর্ণিল করে তোলে।
কুয়াকাটার মিশ্রিপাড়া সীমা বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ মহাথেরো উত্তম ভিক্ষু জানান, প্রতিবছর প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস উড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে গৌতম বুদ্ধকে স্মরণ করেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা। এ উপলক্ষে রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ সকালে পরিষ্কার পোশাকে বৌদ্ধবিহারে যান। সেখানে প্রার্থনা, ধ্যানচর্চা ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.আরিফুজ্জামান বলেন, প্রবারণা পূর্নিমা উপলক্ষে উপজেলার ২৮ টি রাখাইন পাড়ায় বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাখাইন পল্লীগুলোতে নিরাপত্তায় জোরদার করা হয়েছে।
রাখাইন ভিক্ষুরা জানান, প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাসের বর্ষাবাস শেষে এই তিথিতে উৎসব পালিত হয়। বর্ষাবাসের সময় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নির্দিষ্ট বিহারে অবস্থান করে ধর্মচর্চা, ধ্যান ও সাধনায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর মতে, প্রবারণা হলো সাধনার পর্যালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং ভুল সংশোধনের অঙ্গীকারের দিন। নিজের দোষ স্বীকার করা, অন্যের প্রতি ক্ষমাশীল হওয়া এবং সব প্রাণীর মঙ্গল কামনা এই উৎসবের মূল শিক্ষা।






