সন্ধ্যায় একটু খোলা বাতাসে বসতে গেলেই বা ঘরের কোণ থেকে হঠাৎ করেই মশার হানা—আমাদের নিত্যদিনের চেনা এক বিড়ম্বনা। তবে কখনো কি মনে হয়েছে, পরিবারের অন্য সবার চেয়ে আপনাকেই যেন মশা বেশি আক্রমণ করে? বিষয়টি কিন্তু স্রেফ কোনো ধারণা নয়, এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ।
কেন মশা কিছু নির্দিষ্ট মানুষকে বেশি টানে, এর কামড়ে এত চুলকানি কেন হয় এবং কীভাবে আপনি মশার উপদ্রব থেকে নিরাপদ থাকবেন, সেটাই আজকের লেখার বিষয়বস্তু।
মশা কাদের বেশি পছন্দ করে?
আমাদের শরীরের কিছু প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও অভ্যাসের কারণে মশা আমাদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। যেমন:
কার্বন ডাই-অক্সাইড: আমরা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ি। ব্যায়াম বা কোনো শারীরিক পরিশ্রমের সময় এর পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। মশা এই গ্যাসের উপস্থিতি দূর থেকেই বুঝতে পারে এবং সেই উৎসটির দিকে এগিয়ে যায়।
শরীরের গন্ধ ও ঘাম: মানুষের ঘাম ও ত্বকে থাকা নানা রাসায়নিক যৌগ (যেমন ল্যাকটিক অ্যাসিড বা অ্যামোনিয়া) মশার খুব পছন্দের। শরীরের এই গন্ধ মূলত জিনগত বা ত্বকে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভিন্নতার কারণে তৈরি হয়। তাই বংশগত কারণেও কেউ কেউ মশার সহজ শিকারে পরিণত হন।
পোশাকের রঙ: গবেষণায় দেখা গেছে, মশা কালো বা গাঢ় রঙের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। তাই গাঢ় পোশাক পরলে মশার কামড় খাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
শরীরের তাপমাত্রা ও জলীয় বাষ্প: আমাদের শরীর থেকে যে তাপ ও জলীয় বাষ্প নির্গত হয়, মশা খুব সহজেই তা বুঝতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত গরমে যারা ঘেমে যান, তাদের প্রতি মশার আকর্ষণ বেশি থাকে।
অন্যান্য কারণ: গবেষণা বলছে, বিয়ার বা অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় গ্রহণকারী এবং গর্ভবতী নারীদের শরীরের তাপমাত্রা ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ার হার বেশি থাকায় মশা তাদের বেশি কামড়ায়।
মশা কোথায় বেশি কামড়ায়?
রক্ত সংগ্রহের জন্য মশা সাধারণত খোলা ত্বকের যেকোনো অংশেই কামড়াতে পারে। তবে গবেষকদের মতে, শরীরের তাপমাত্রা ও ঘর্মগ্রন্থির আধিক্যের কারণে মশা মাথা ও পায়ের দিকে বেশি কামড়াতে পছন্দ করে।
মশা যখন কামড়ায়, তখন সেটি ত্বকে তার সূঁচালো মুখ ঢুকিয়ে রক্ত জমাট বাঁধা রোধ করার জন্য সামান্য লালা বা থুথু প্রবেশ করায়। এই লালার রাসায়নিক পদার্থের বিরুদ্ধে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম প্রতিক্রিয়া দেখায়, যার ফলেই ত্বকে লালচে ভাব, ফোলা ভাব এবং তীব্র চুলকানি শুরু হয়। ছোট শিশু বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রতিক্রিয়া একটু বেশি হতে পারে।
মশার কামড় থেকে মুক্তির সহজ উপায়
মশার কামড় খাওয়ার পর চুলকানি কমাতে ও আরাম পেতে কিছু পদ্ধতি মেনে চলতে পারেন:
চুলকাবেন না: চুলকালে ফোলা বাড়ে এবং ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে ইনফেকশনের ঝুঁকি তৈরি হয়।
ঠান্ডা সেঁক দিন: কামড়ানো স্থানে ঠান্ডা কাপড় বা বরফের প্যাক ব্যবহার করলে চুলকানি ও ফোলাভাব দ্রুত কমে যায়।
ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করুন: ক্যালামাইন লোশন বা হাইড্রোকরিসোন ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ খাওয়া যেতে পারে।
যেভাবে মশা থেকে সুরক্ষিত থাকবেন
মশা তাড়ানোর স্প্রে বা ক্রিম ব্যবহার করুন: গায়ে লাগানোর উপযোগী কার্যকরী উপাদান (যেমন ডিট বা ইউক্যালিপটাস তেলযুক্ত ক্রিম) ব্যবহার করুন।
সঠিক পোশাক নির্বাচন করুন: সম্ভব হলে ফুল হাতা শার্ট ও লম্বা প্যান্ট পরুন এবং হালকা রঙের পোশাক বেছে নিন।
সতর্ক থাকুন: মশার সবচেয়ে বেশি উপদ্রব হয় ভোরবেলা এবং গোধূলি লগ্নে। এই সময়গুলো যথাসম্ভব ঘরের ভেতরে থাকার চেষ্টা করুন।
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন: ঘরের আশপাশে বা ফুলের টবে জমিয়ে রাখা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করুন, যাতে মশা ডিম পাড়ার সুযোগ না পায়। এ ছাড়া দরজা-জানালায় মশারি বা নেট লাগিয়ে ঘর সুরক্ষিত রাখুন।
মশার কামড় কেবল সামান্য অস্বস্তিকরই নয়, এটি ডেঙ্গুর মতো মারাত্মক রোগও ছড়াতে পারে। তাই একটু সচেতনতা এবং সঠিক সুরক্ষাই পারে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে।






