ঘূর্ণিঝড় অর্ণবে অন্ধপ্রদেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, নিহত ২

ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের কারণে এখনো পর্যন্ত ভারতে দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুটি মৃত্যুই ঘটেছে তড়িদাহত হয়ে।

এর মধ্যে বুধবার সকালের দিকে অন্ধপ্রদেশের আনাকাপল্লী জেলার ইলামানচিলি শহরে ৫৫ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যু হয়। বাড়ির পাশের জমা পানিতে পড়ে থাকা বিদ্যুতের তারের সাথে সংস্পর্শে এসে তড়িদাহত তিনি।

এর আগে মঙ্গলবার রাতে বিশাখাপত্তনম জেলায় ৫৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। কৃষি জমিতে পড়ে থাকা বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে এসে তিনি মারা যান।

বুধবার ভোর রাতে অন্ধ্রপ্রদেশ-ইয়ানাম উপকূল দিয়ে স্থলভাগে আঘাত হানে। ল্যান্ডফল প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে লাগে প্রায় ছয় ঘন্টার বেশি সময় (মঙ্গলবার দিবাগত রাত দুটো থেকে বুধবার সকাল আটটা)। এর ফলে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশার উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ভারী বৃষ্টিপাত, দমকা হাওয়া এবং সমুদ্রের উত্তাল জলরাশি দেখা গেছে।

অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ‘অতি তীব্র’ ঘূর্ণিঝড়’এর কারণে গাছপালা উপড়ে পড়ে, বিদ্যুতের খুটি উপরে পড়ে। এর ফলে রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ হয়ে যায়, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। ব্যাহত হয় ট্রেন চলাচল ও বিমান চলাচল। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় আগে থেকেই একাধিক রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল, এমনকি একাধিক বিমানের ওঠানামাও বাতিল করা হয়।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী’ (এনডিআরএফ)-এর ৩৯টি দল এবং রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী’ (এসডিআরএফ)-এর ৮০টি দল মোতায়েন করা হয়েছে।

এনডিআরএফ-এর মহাপরিদর্শক নরেন্দ্র সিং বুন্দেলা জানিয়েছেন যে, দলগুলো মাঠপর্যায়ে কাজ করছে।

এনডিআরএফ কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্ধ্রপ্রদেশে ৭১৪টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৩০টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বুধবারই সকালের দিকে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু জেলা কালেক্টরসহ ৩২,০০০ কর্মীর সঙ্গে এক টেলিকনফারেন্সে পরিস্থিতির পর্যালোচনা করেন এবং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন যেন সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি যথাসম্ভব কমিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়।

পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি লিখে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলিতে ‘জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী’র (এনডিআরএফ) সহায়তা বাড়ানোর আর্জি জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

পাশাপাশি, ঘূর্ণিঝড়ের ফলে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা খতিয়ে দেখার জন্য কেন্দ্রীয় দলগুলিকে দ্রুত মোতায়েন করারও আর্জিও জানিয়েছেন নাইডু। এদিন সকালে দিকেই আনাকাপল্লির পেয়াকারাওপেটাতে ঘূর্ণিঝড়-বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন অন্ধ্রপ্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভি অনিথা।

অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় ওড়িশা রাজ্য সরকার ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে।

বুধবারও রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী সুরেশ পূজারি মন্ত্রী।

মন্ত্রী জানান, রাজ্যের সব দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার মধ্যে মালকানগিরি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কর্মী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে এবং মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়টি বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশের ভেতরে রয়েছে এবং বিকেলের দিকে এটি ওড়িশায় প্রবেশ করবে।’

তবে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯.৫০ মিনিটের বুলেটিনে ভারতের আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) জানিয়েছে, বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’—যা আগে ‘অতি তীব্র’ ঘূর্ণিঝড় ছিল—তা দুর্বল হয়ে ‘তীব্র’ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়টি ইয়ানামের দক্ষিণ-পশ্চিমে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূল অতিক্রম করেছে। এই সময় বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২৫-১৩৫ কিলোমিটার এবং দমকা হাওয়ার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত।

আইএমডি জানিয়েছে, উপকূল অতিক্রম করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রস্থল পুরোপুরি স্থলভাগের ওপর চলে এসেছে।

ঘূর্ণিঝড়ের তেমন প্রভাব পশ্চিমবঙ্গে এখনও না পড়লেও সমুদ্রগুলোতে পানির স্তর বেড়েছে। পাড়গুলিতে উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়তেও দেখা গেছে। মঙ্গলবার রাত থেকে উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি, কলকাতা সহ একাধিক জেলার বেশ কিছু জায়গায় হালকা বৃষ্টিপাত হয়। যদিও বুধবার সকাল থেকে আবহাওয়া মোটামুটি শুষ্ক রয়েছে।

যদিও উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, দমকা হাওয়া এবং বিভিন্ন পরিচালনগত সীমাবদ্ধতার কারণে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক (এনএসসিবিআই) বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া ও সেখানে অবতরণকারী বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল করার খবর পাওয়া গেছে।

বুধবার সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘উপকূলীয় অঞ্চল ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর কারণে সৃষ্ট দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, দমকা হাওয়া এবং পরিচালনগত সীমাবদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতে, নিরাপত্তার খাতিরে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলো কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক (এনএসসিবিআই) বিমানবন্দরে আসা ও সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল করেছে অথবা সেগুলোর কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটেছে।’

  • Related Posts

    এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার গেট ভাঙচুর

    পুরাতন বাণিজ্য মেলা প্রাঙ্গণ হস্তান্তরের দাবিতে কঠোর কর্মসূচিতে নেমেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীরা। বুধবার (২৮ অক্টোবর) আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার গেট ভাঙচুর চালিয়েছেন। পূর্বঘোষিত…

    সাইবার হামলার আশঙ্কায় বন্ধ এনআইডি সার্ভারের কার্যক্রম

    সাইবার হামলার আশঙ্কায় জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সার্ভার সাময়িক বন্ধ করে রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বুধবার (২৮ অক্টোবর) নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এনআইডি শাখা থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে এনআইডি…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার গেট ভাঙচুর

    এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার গেট ভাঙচুর

    সাইবার হামলার আশঙ্কায় বন্ধ এনআইডি সার্ভারের কার্যক্রম

    সাইবার হামলার আশঙ্কায় বন্ধ এনআইডি সার্ভারের কার্যক্রম

    আলো স্বল্পতায় বন্ধ খেলা , সেঞ্চুরির অপেক্ষায় সাদমান

    আলো স্বল্পতায় বন্ধ খেলা , সেঞ্চুরির অপেক্ষায় সাদমান

    স্ট্রোক কি প্রতিরোধ যোগ্য?

    স্ট্রোক কি প্রতিরোধ যোগ্য?

    তিন-চতুর্থাংশ ভোট গণনা শেষে এগিয়ে নেতানিয়াহুর জোট

    তিন-চতুর্থাংশ ভোট গণনা শেষে এগিয়ে নেতানিয়াহুর জোট

    জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের তদন্ত কমিটি গঠন

    জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের তদন্ত কমিটি গঠন