প্রায় ৬০ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা ধারণা করে আসছিলেন যে দানবীয় শিকারি ডাইনোসর ‘টাইরানোসরাস রেক্স’ বা টি-রেক্স হয়তো উষ্ণরক্তের প্রাণী ছিল। ২০২২ সালে আলাস্কায় টি-রেক্সের একটি ফসিলযুক্ত পদচিহ্ন আবিষ্কৃত হলে সেই ধারণার পক্ষে নতুন প্রমাণ যুক্ত হয়। পদচিহ্নটি নির্দেশ করেছিল যে এরা বরফশীতল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারত, যা সাধারণ শীতলরক্তের সরীসৃপের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সাইন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা এই সুদীর্ঘ প্রশ্নের একটি সুনির্দিষ্ট উত্তর দাঁড় করিয়েছে।
গবেষকরা প্রথমবারের মতো সরাসরি টি-রেক্সের শরীরের তাপমাত্রা নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন, যা প্রায় ৯৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ, এই প্রাচীন শিকারির শরীরের তাপমাত্রা বর্তমান মানুষের শারীরিক তাপমাত্রার অনেকটাই কাছাকাছি ছিল।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউসিএলএ) ভূ-জীববিজ্ঞানী এবং সহযোগী অধ্যাপক রবার্ট ইগল এই গবেষণার সহ-লেখক হিসেবে জানিয়েছেন, এটি এখন পর্যন্ত টি-রেক্সের প্রকৃত শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ সীমাবদ্ধতা উপস্থাপন করেছে। প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগের এই প্রাণীর জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে এটি গবেষকদের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে। গবেষণায় ব্যবহৃত দলটি ‘থমাস দ্য টি-রেক্স’ নামের একটি প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পূর্ণ কঙ্কালের দুটি ছোট দাঁতের অংশ ব্যবহার করে এই পরিমাপ সম্পন্ন করে। লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকা এই বিশেষ কঙ্কালের প্রদর্শনীতে না থাকা দুটি দাঁতের মাত্র কয়েক মিলিগ্রাম এনামেল সংগ্রহ করা হয়েছিল।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ও ইউসিএলএর জলবায়ু বিজ্ঞানী আরাধনা ত্রিপাঠি জানান, একটি বিখ্যাত প্রাণীর ক্ষেত্রে এত কম তথ্যের উপস্থিতি সত্যিই বিস্ময়কর। হাড় এবং বায়োমেকানিক্স থেকে এর বিপাক প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অনুমান থাকলেও সুনির্দিষ্ট কোনো তাপমাত্রা বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না। তবে দাঁতের এনামেলের রসায়ন যে তাপমাত্রায় গঠিত হয়েছিল, তা প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর পরও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পড়া সম্ভব হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা এই পরীক্ষায় দাঁতকে মূলত একটি প্রাগৈতিহাসিক থার্মোমিটার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। দাঁতের এনামেলের ভেতর কার্বন ও অক্সিজেনের বিভিন্ন আইসোটোপ থাকে, যা নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ভিত্তিতে একে অপরের সাথে বন্ধন তৈরি করে। ঠাণ্ডা তাপমাত্রায় বেশি বন্ধন তৈরি হয় এবং গরম তাপমাত্রায় কম বন্ধন গঠিত হয়। দাঁতের ক্ষয়প্রাপ্ত ছোট অংশ থেকে আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে এনামেল গঠনের সময়ের সঠিক তাপমাত্রা বের করা সম্ভব হয়েছে। শরীরের অন্য যেকোনো হাড়ের চেয়ে দাঁত ব্যবহার করা বেশি কার্যকর, কারণ দাঁতের শক্ত এনামেল লাখ লাখ বছর ধরে পরিবর্তিত না হয়ে একই অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে।
ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রধান শিক্ষক ও মেরুদণ্ডী প্রাক্জীববিজ্ঞানী থমাস হোল্টজ জুনিয়র মন্তব্য করেছেন যে, ১৮৪২ সালে রিচার্ড ওয়েনের গবেষণার মাধ্যমে যখন প্রথম ডাইনোসর নামকরণ করা হয়েছিল, তখন থেকেই তারা ডাইনোসর উষ্ণরক্তের ছিল কি না তা নিয়ে ভাবছেন। তবে বর্তমান পদ্ধতিটি পূর্বের অনুমানের জায়গা পার হয়ে সর্বোচ্চ নিখুঁতভাবে এই সত্যটি যাচাই করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
যদিও টি-রেক্সকে সরীসৃপের শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে এর ৯৭ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উচ্চ তাপমাত্রা আধুনিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর সীমানায় পড়ে। সাধারণ শীতলরক্তের সরীসৃপের তাপমাত্রা সাধারণত ৮২ থেকে ৮৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। কিন্তু টি-রেক্সের এই অতিরিক্ত তাপমাত্রা তাদের উচ্চমাত্রার শক্তি জোগাতে সাহায্য করত। ডাইনোসররা সরীসৃপ হলেও তাদের সাথে আধুনিক পাখিদের একটি বিবর্তনীয় যোগসূত্র রয়েছে। টি-রেক্সের শরীরের এই তাপমাত্রা পাখিদের চেয়ে কম হলেও সাধারণ সরীসৃপের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে বিবর্তনীয় ধারায় এদের একটি অনন্য মধ্যবর্তী অবস্থানে দাঁড় করায়। এই উষ্ণ শারীরিক কাঠামোর কারণে টি-রেক্স শিকারের পেছনে একটানা দীর্ঘ সময় জুড়ে সক্রিয় থাকতে পারত এবং অতিরিক্ত দৌড়াদৌড়ি করতে পারত, যা আধুনিক কুমিরের মতো সংক্ষিপ্ত দৌড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
উষ্ণ রক্তের এই বৈশিষ্ট্যের কারণে টি-রেক্স উত্তর আমেরিকার বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে বিচরণ করতে পেরেছিল। তৎকালীন জলবায়ুর মডেল পুনর্নির্মাণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, টি-রেক্স বর্তমান মেক্সিকো থেকে শুরু করে একদম বরফাবৃত আলাস্কা পর্যন্ত যেকোনো অঞ্চলে চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়ে বসবাস করতে সক্ষম ছিল। ত্রিপাঠির মতে, টি-রেক্স আশপাশের পরিবেশের চেয়ে বেশি গরম ছিল এবং এর ফলেই তারা সুমেরু অঞ্চলের মতো স্থানেও বিচরণ করতে পেরেছিল, যা রোদ পোহানো যেকোনো সাধারণ সরীসৃপের পক্ষে অসম্ভব। তবে এর একটি নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জও ছিল। উচ্চ বিপাকীয় হার বজায় রাখতে এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে টি-রেক্সকে বিশাল পরিমাণ খাবার গ্রহণ করতে হতো, যার জন্য এদের ঘন ঘন শিকারে নামতে হতো। ইগল এবং তার গবেষণা দল আশা করছেন যে ভবিষ্যতে এই আইসোটোপিক থার্মোমেট্রি প্রযুক্তি অন্যান্য বিলুপ্ত প্রজাতির ওপর প্রয়োগ করে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিবর্তন এবং তাদের উষ্ণরক্তে রূপান্তরের সঠিক সময়কাল অনুসন্ধান করা সম্ভব হবে।
সূত্র: সিএনএন






