ছোট শিশু মানেই চঞ্চলতা, দুষ্টুমি আর নানা রকম আবদার। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে কোনো কোনো শিশুর রাগ, জেদ কিংবা আক্রমণাত্মক আচরণও দেখা দিতে পারে। চার বছরের একটি শিশুকে নিয়ে এমনই সমস্যায় পড়েছেন এক মা। তার অভিযোগ, সন্তান সবার গায়ে হাত তোলে, রেগে গিয়ে জিনিসপত্র ভেঙে ফেলে এবং কোনো কথা শুনতে চায় না।
এ অবস্থায় সন্তানকে শান্ত ও ভালো করার জন্য শরিয়তসম্মত কী আমল করা যায়- জানতে চেয়েছেন ওই মা। জবাবে আলেমরা দোয়া ও আমলের পাশাপাশি শিশুর সঙ্গে ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ এবং পারিবারিক পরিবেশের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গাজীপুর মিরাশপাড়া বাইতুল মামুর জামে মসজিদ খতিব মুফতী সিরাজুল ইসলাম।
শিশুর জন্য পড়ুন এই দোয়া
সিরাজুল ইসলাম জানান, শিশুকে বদনজর ও অনিষ্ট থেকে রক্ষার জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য দোয়া করতেন। শিশুর মাথায় হাত রেখে এই দোয়া পড়ে ফুঁ দেওয়া যেতে পারে-
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ
অর্থ: ‘আমি তোমাকে আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের আশ্রয়ে সমর্পণ করছি সব ধরনের শয়তান, ক্ষতিকর প্রাণী এবং অনিষ্টকারী বদনজর থেকে।’
সকাল ও সন্ধ্যায় শিশুর মাথায় হাত রেখে এই দোয়া পড়া যেতে পারে। এ ছাড়া সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি এবং সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে শিশুর শরীরে ফুঁ দেওয়া যেতে পারে।
সন্তানের জন্য কোরআনের দোয়া
সন্তানকে নেক ও চোখের শীতলতা হিসেবে পাওয়ার জন্য বাবা-মায়ের নিয়মিত দোয়া করা উচিত। নামাজের পর পড়া যেতে পারে সূরা ফুরকানের এই আয়াত-
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
অর্থ: ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্য থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য অনুসরণযোগ্য করুন।’
আরেকটি দোয়া রয়েছে সূরা ইবরাহিমে-
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاء
অর্থ: ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সালাত কায়েমকারী বানান এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও; হে আমাদের প্রতিপালক! আমার দোয়া কবুল করুন।’
শুধু আমল নয়, দরকার ভালোবাসাও
শিশুর আচরণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু দোয়া-আমলের ওপর নির্ভর না করে তার সঙ্গে বাবা-মায়ের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ ﷺ শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তিনি বলেছেন-
«مَنْ لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَمْ»
অর্থ: ‘যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।’
তাই শিশুকে নিয়মিত আদর করা, জড়িয়ে ধরা, কপালে চুমু দেওয়া এবং ভালোবাসার কথা বলা তার নিরাপত্তাবোধ বাড়াতে পারে। শিশু রেগে গেলে পাল্টা চিৎকার বা মারধর না করে শান্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে। ভাঙচুর বা কাউকে আঘাত করার আশঙ্কা থাকলে তাকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে হবে এবং শান্তভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হবে।
পরিবারের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ
শিশুরা বড়দের আচরণ খুব দ্রুত অনুকরণ করে। তাই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অতিরিক্ত চিৎকার-চেঁচামেচি, ঝগড়া কিংবা রাগারাগি থাকলে তা শিশুর আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। ঘরের পরিবেশ যতটা সম্ভব শান্ত ও স্নেহপূর্ণ রাখা জরুরি।
এ ছাড়া শিশুর মোবাইল ফোন ব্যবহার ও মারমুখী বা অতিরিক্ত উত্তেজনাপূর্ণ কার্টুন দেখার অভ্যাসের দিকেও নজর দেওয়া দরকার। স্ক্রিন ব্যবহারের সময় সীমিত করা এবং শিশুকে খেলাধুলা, গল্প শোনা বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
শিশু যখন ভালো আচরণ করবে, তখন তার প্রশংসা করুন। ছোটখাটো পুরস্কার বা উৎসাহও দেওয়া যেতে পারে। এতে ভালো আচরণ করার আগ্রহ বাড়তে পারে।
অর্থাৎ, শিশুকে শান্ত করার পথ শুধু একটি আমলে সীমাবদ্ধ নয়। দোয়া ও কোরআনি আমলের পাশাপাশি ধৈর্য, ভালোবাসা, পারিবারিক পরিবেশ এবং শিশুর আচরণ বুঝে তাকে পরিচালনা করাও জরুরি।






