মুহূর্তেই নবীজির (সা.) দোয়া কবুলের বিস্ময়কর ঘটনা

১. প্রিয় নবীজি (সা.) একবার মসজিদে নববিতে জুমার খুতবা দিচ্ছেন। এমন সময় এক সাহাবী এসে বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! অনাবৃষ্টি ও তীব্র দুর্ভিক্ষে রাস্তাঘাট ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, আমাদের গবাদি পশুগুলো পানির অভাবে মারা যাচ্ছে, কুয়ার মধ্যে কোনো পানি নাই। আপনি আল্লাহর কাছে একটু দোয়া করেন, আল্লাহ যেন আমাদের বৃষ্টি দান করেন।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) সঙ্গে সঙ্গে খুতবা থামিয়ে দুই হাত তুললেন। আমরা তো সাধারণত হাত কিছুটা তুলে দোয়া করি, রাসুলুল্লাহ (সা.) মাঝে মাঝে দোয়ায় হাত এত উঁচুতে তুলতেন যে তাঁর বগলের শুভ্রতা পর্যন্ত দেখা যেত। তিনি হাত আকাশের দিকে তুলে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে আকুতি জানাতে লাগলেন-

‘আল্লাহুম্মা-সকিনা, আল্লাহুম্মা-সকিনা, আল্লাহুম্মা-সকিনা।’
‘হে আল্লাহ! তুমি আমাদের বৃষ্টি দাও, আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ কর।’

আল্লাহ তাআলা তার নবীর আবেদন কবুল করলেন। তখনই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। ওই জুমার দিন বৃষ্টি শুরু হলো, এরপর শনিবার, রোববার, সোমবার, মঙ্গলবার—এভাবে টানা সাত দিন ধরে বৃষ্টি চলল। সাহাবিরা বর্ণনা করেন, ওই টানা সাত দিনে তারা মদিনার আকাশে আর সূর্য দেখতে পাননি।

পরের জুমাবারে প্রিয় নবীজি (সা.) যখন পুনরায় মসজিদে নববিতে জুমার খুতবা দিচ্ছেন, তখন আবার সেই সাহাবিই দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! মদিনায় এত বৃষ্টি হয়েছে যে এখন বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এবার আপনি বৃষ্টি বন্ধের জন্য দোয়া করুন! অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে আমাদের গবাদি পশু মারা যাচ্ছে এবং রাস্তাঘাট ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) এ কথা শুনে আবার হাত তুলে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন—

‘হে আল্লাহ! আমাদের এখানে তো পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়েছে, এবার আপনি আমাদের চারপাশের শুকনো অঞ্চলগুলোতে বৃষ্টি দিন। মদিনা শহরের ওপর আর বৃষ্টি দিয়েন না।’

নবীজির (সা.) এই দোয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যেই মদিনার ওপর থেকে মেঘগুলো চারদিকে সরে যেতে শুরু করল।

নামাজের পর সাহাবিরা মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখলেন, মদিনার আকাশ একেবারে পরিষ্কার এবং সূর্য দেখা যাচ্ছে, অথচ দূর-দূরান্তের চারপাশের অঞ্চলে বিজলি চমকাচ্ছে আর মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এ রকমই ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়ার বরকত। তিনি যে কোনো দোয়া করা মাত্রই তা সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়ে যেত।

২. হজরত আনাস (রা.)-এর জন্য প্রিয় নবীজি (সা.) বিশেষ দোয়া করেছিলেন। হজরত আনাসের (রা.) মা রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার ছেলেটার জন্য একটু দোয়া করে দিন।’ তখন নবীজি দোয়া করেছিলেন—

‘হে আল্লাহ! আপনি আনাসের সম্পদে এবং সন্তানে বরকত দান করুন।’

এই দোয়া এমনভাবে কবুল হয়েছিল যে, হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘মদিনার অন্য সবার খেজুর বাগানে বছরে একবার খেজুর হতো, কিন্তু নবীজির (সা.) দোয়ার বরকতে আমার খেজুর বাগানে বছরে দুইবার করে ফলন হতো।’ আর হজরত আনাসের (রা.) মোট সন্তানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৮২ জনে! আল্লাহ তাআলা তার নবীর দোয়ার বরকতে এমন অলৌকিক প্রাচুর্য দান করেছিলেন।

৩. হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সপ্তম হিজরিতে ইমান এনেছিলেন। তিনি চাইতেন তার মা-ও ইমানের সৌভাগ্য লাভ করুন। কিন্তু তার বৃদ্ধা মা কুফরের ওপর অনড় ছিলেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) এটি কিছুতেই সহ্য করতে পারতেন না যে, তিনি নিজে জান্নাতে যাবেন আর তার মা ইমান না এনে জাহান্নামি হবেন। তা ছাড়া তার মা শুধু কুফরের ওপর ছিলেন তাই নয়, বরং রাসুলকে (সা.) গালিগালাজ করতেন এবং কটু কথা বলতেন। মায়ের মুখে প্রিয় নবীজির (সা.) বিরুদ্ধে এমন মন্দ কথা শুনে হজরত আবু হুরায়রার (রা.) বুক ফেটে যেত।
একদিন তিনি ব্যাকুল হয়ে প্রিয় নবীজির (সা.) দরবারে এসে বললেন— ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি আমার মায়ের জন্য একটু দোয়া করে দিন, যাতে আল্লাহ আমার মাকে হেদায়েত দান করেন।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) তৎক্ষণাৎ হাত তুলে দোয়া করলেন—

‘হে আল্লাহ! আবু হুরায়রার মাকে আপনি হেদায়েত দান করুন।’

নবীজির (সা.) মুখ থেকে এই দোয়া শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে আবু হুরায়রা (রা.) বাড়ির দিকে ছুটলেন, যে দেখি নবীজির (সা.) দোয়ার বরকতে কী হয়! বাড়িতে গিয়ে তিনি দেখলেন ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করা। ভেতর থেকে তার মা বললেন, ‘আবু হুরায়রা, তুমি একটু বাইরে অপেক্ষা কর, আমি আসছি।’

আবু হুরায়রা (রা.) তার মায়ের গোসলের আওয়াজ শুনতে পেলেন। গোসল শেষ করে তিনি সুন্দর পরিষ্কার পোশাক পরিধান করে দরজা খুলে সামনে এসে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন—

‘আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয় আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু’

অর্থাৎ ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও প্রেরিত রাসুল।

মায়ের মুখে এই শাহাদাতের কালিমা শুনে আবু হুরায়রা (রা.) আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লেন। তিনি আর কথা না বাড়িয়ে ওখান থেকেই উল্টো ঘুরে আবার রাসুলের (সা.) দরবারে ছুটে গেলেন।

আবু হুরায়রাকে এত আনন্দ ও উৎফুল্লতা নিয়ে আসতে দেখে রাসুল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আবু হুরায়রা! তুমি তো বাড়িতে গিয়েছিলে, সেখানে কী দেখে এলে?’

আবু হুরায়রা (রা.) অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি আমার নিজের ঘরে পৌঁছানোর আগেই আপনার পবিত্র দোয়া আমার ঘরে পৌঁছে গেছে! ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি পৌঁছানোর আগেই আপনার দোয়ায় আমার মা কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেছেন!’

এ দোয়া কবুলের বিষয়গুলো ছিল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রিয় হাবিবকে দান করা অনন্য এক মুজিজা। সিরাত ও হাদিসের গ্রন্থসমূহ পাঠে এমন অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যায়, যেখানে রাসুলের (সা.) দোয়া আল্লাহ তাআলা মুহূর্তের মধ্যে কবুল করে নিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!

  • Related Posts

    অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস ব্যবধানে হারাল দক্ষিণ আফ্রিকা

    প্রথম ইনিংসে মাত্র ৯৯ রানে অলআউট হওয়ার পরও ম্যাচ বাঁচাতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক টেম্বা বাভুমার দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে বড় সংগ্রহ গড়ার পর বোলারদের নৈপুণ্যে অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস ও ৩১ রানে…

    পিএইচপিতে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি, বাংলাদেশেও সাইবার সতর্কতা জারি

    বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ওয়েবসাইট তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং প্রযুক্তি পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর। এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সাইবার অপরাধীরা ব্যবহারকারীর…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    মুহূর্তেই নবীজির (সা.) দোয়া কবুলের বিস্ময়কর ঘটনা

    মুহূর্তেই নবীজির (সা.) দোয়া কবুলের বিস্ময়কর ঘটনা

    অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস ব্যবধানে হারাল দক্ষিণ আফ্রিকা

    অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস ব্যবধানে হারাল দক্ষিণ আফ্রিকা

    পিএইচপিতে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি, বাংলাদেশেও সাইবার সতর্কতা জারি

    পিএইচপিতে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি, বাংলাদেশেও সাইবার সতর্কতা জারি

    নারী হ্যান্ডবলে রানার্সআপ বাংলাদেশ

    নারী হ্যান্ডবলে রানার্সআপ বাংলাদেশ

    জমির নামজারিতে বড় পরিবর্তন, উত্তরাধিকারীদের জন্য নতুন নিয়ম

    জমির নামজারিতে বড় পরিবর্তন, উত্তরাধিকারীদের জন্য নতুন নিয়ম

    কমলাপুর রেলস্টেশনে এসআরবির মাদকবিরোধী অভিযান

    কমলাপুর রেলস্টেশনে এসআরবির মাদকবিরোধী অভিযান