কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি আর মানুষের তৈরি কোনো সাধারণ ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি এখন নিজেকে নিজেই উন্নত করার সক্ষমতা অর্জনের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল এআই নিজের ওপর কাজ করে নতুন সংস্করণ তৈরি করতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় নেবে। তবে এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক মনে করছেন, এই নাটকীয় পরিবর্তন এক বছর আগেই, অর্থাৎ ২০২৭ সালের মধ্যেই বাস্তবায়িত হতে চলেছে।
সম্প্রতি নিজের ব্যক্তিগত নিউজলেটার ‘ইমপোর্ট এআই’-তে তিনি এই আশাবাদী ধারণার কথা ব্যক্ত করেছেন।
জ্যাক ক্লার্কের এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে একটি নতুন বেঞ্চমার্ক পরীক্ষা, যার নাম ‘টেস্টভ্যাল’। পি-জিরো রিসার্চের তৈরি এই মূল্যায়ন পদ্ধতিটি প্রকাশ করেছে যে এআই-এর নিজস্ব গবেষণাসংক্রান্ত বিচারবুদ্ধি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আশঙ্কাজনক গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিগত কয়েক মাসে প্রতি তিন মাস পরপর এআই প্রযুক্তির এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক বিচারবুদ্ধি প্রায় দ্বিগুণ হারে উন্নত হয়েছে। গবেষণায় কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনটি এড়িয়ে যাওয়া উচিত—এই প্রাথমিক কৌশল নির্ধারণ থেকে শুরু করে পরীক্ষার নকশা তৈরি ও ফলাফলের সঠিক বিশ্লেষণ করার দক্ষতাকে গবেষণার বিচারবুদ্ধি বলা হয়। মূলত একজন সাধারণ ল্যাব সহকারী ও অভিজ্ঞ গবেষকের অভিজ্ঞতার মধ্যকার ব্যবধানটিই এআই পূরণ করে ফেলছে।
এই ধারণার মূল ভিত্তি হলো ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ বা পুনরাবৃত্তিমূলক স্ব-উন্নয়ন ব্যবস্থা। যখন কোনো এআই প্রযুক্তি নিজে থেকেই এআই বিষয়ক গবেষণায় পারদর্শী হয়ে উঠবে, তখন মানুষের সহায়তা ছাড়াই সেটি নিজের চেয়েও শক্তিশালী ও কার্যকর কোনো এআই তৈরি করতে পারবে। সেই নতুন এআই পরবর্তীতে তার চেয়েও উন্নত আরেকটি এআই ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এই স্বয়ংক্রিয় ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চালু হলে প্রযুক্তিটির অগ্রগতির জন্য আর হাজার হাজার মানব গবেষকের ওপর নির্ভর করতে হবে না।
আইটি খাতের একাধিক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তুলনা করে এআই-এর এই সাম্প্রতিক দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ডেটা প্রস্তুত করা এবং মডেল তৈরি করার মতো বাস্তবভিত্তিক আটটি কঠিন কাজে এআই-কে পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষায় ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড, এনভিডিয়া ও মাইক্রোসফট রিসার্চের ২৪ জন অভিজ্ঞ গবেষক অংশ নিয়েছিলেন। চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, অ্যানথ্রোপিকের নতুন মডেল ‘ওপাস ৫.৫’ শীর্ষ মানব গবেষকদের পারফরম্যান্সকে ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মানুষের পেছনে যে খরচ হয়, এআই মডেলটি তার ৩০ ভাগের মাত্র ১ ভাগ খরচেই এই কাজগুলো সম্পন্ন করতে পেরেছে।
ক্লার্ক জানান, এআই নিজে নিজেই তৈরি হতে শুরু করবে কি না, তা নির্ধারণের সবচেয়ে বড় নিয়ামক ছিল এর উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল ক্ষমতা। চলতি বছরের শুরুতেও তিনি বিশ্বাস করতেন এআই এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সৃজনশীলতা দেখাতে পারেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গণিতের জটিল সমস্যার সৃজনশীল সমাধান এবং টেস্টভ্যালের মতো উন্নত পরীক্ষার ফলাফল তার চিন্তাভাবনা বদলে দিয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার জটিল ধাপগুলোতে এআই যেভাবে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিচ্ছে, তাতে ২০২৭ সালের মধ্যেই স্ব-উন্নয়নকারী এআই-এর আবির্ভাবের সম্ভাবনা এখন অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন এই এআই গবেষক।
সূত্র: এনডিটিভি






