গোয়েন্দা সংস্থা থেকে তথ্য পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দায়িত্বশীলদের অবহেলায় প্রশাসন যন্ত্রের এই প্রাণকেন্দ্র অরক্ষিত হয়ে উঠেছে। বিদ্যমান নিয়মের তোয়াক্কা না করে যে কেউ ঢুকে পড়ছেন সচিবালয়ে। সচিবালয়ে প্রবেশ পাশ নিয়ে বড় ধরনের গলদ উঠে এসেছে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে-নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নন-ক্যাডার কর্মকর্তারাও বেআইনিভাবে প্রবেশ পাশ ইস্যু করছেন। একাধিক গেট দিয়ে পুলিশ সদস্যরা দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছেন। কোনো কোনো সংসদ-সদস্য ৬-৭ জন নেতাকর্মী সঙ্গে নিয়ে ঢুকে পড়ছেন কেপিআইভুক্ত এই স্থাপনায়। ২০২৪ সালের আন্দোলনের কিছু ছাত্রনেতা হুটহাট করে সচিবালয়ে ঢুকছেন। অথচ প্রধানমন্ত্রী  সচিবালয়ে নিয়মিত অফিস করছেন এবং তার নিরাপত্তার বিষয়টি কেউ আমলেই নিচ্ছেন না। গোয়েন্দা সংস্থার এমন প্রতিবেদনের পর নড়েচড়ে বসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব মো. আব্দুস সাত্তার নিজে এসব অপকর্মের সত্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে ২০ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা সব ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) সংগ্রহ করেছেন। নির্ধারিত এই সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে ইস্যু করা প্রবেশ পাশের ওটিপি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখার কাজও শুরু হয়েছে। এই নিরাপত্তা গলদ নিয়ে করণীয় নির্ধারণে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও।

জানতে চাইলে বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। তিনি  বলেন, স্বরাষ্ট্র সচিব হিসাবে আমি সব অবহিত। তিনি জানান, যা ঘটেছে সেসব যেন আর না ঘটে সে বিষয়ে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র সচিব বলেন, নিচের দিকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললেই জানতে পারবেন।

কথা হয় পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ মাহমুদুল কবীরের সঙ্গে। তিনি  বলেন, আমরা সমস্যাগুলো স্বরাষ্ট্র সচিবকে অবহিত করেছি। তিনি কিছু পরামর্শ এবং কাজের নির্দেশনা দিয়েছেন। এর বাইরে নতুন কিছু নয়। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নিচে অনেক সময় মানুষ ভিড় করেন বিষয়টি জানা আছে কিনা এমন প্রশ্নে-মাহমুদুল কবীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী মানুষকে পছন্দ করেন। তিনি মানুষকে দূরে ঠেলে দিতে চান না। অনেক সময় তিনি মানুষকে ডেকে কাছে নিয়ে কথা শোনেন এবং বলেন। আবার অনেক সময় কথা না বলেই চলে যান। এটা তার ইচ্ছা ও এখতিয়ার।

সচিবালয়ে দায়িত্বরত একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা  জানান, গত কয়েক মাস ধরে আমরা লক্ষ্য করছি পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অবাধে সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে আমরা আপত্তি দিলে পুলিশ সদস্যরা অসন্তুষ্ট হন। একপর্যায়ে আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাই এবং কর্মকর্তারা আমাদের সচিবালয় প্রবেশপথ পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেন। পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার রাকিবুল হাসান ২৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে প্রবেশ পাশ ইস্যু করেছেন। ওই তারিখে তিনি দুটি পাশ ইস্যু করেছেন। তিনি একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা এবং অথচ পাশ ইস্যুর এখতিয়ারই তার নেই।

এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা সিস্টেম অ্যানালিস্ট মো. শফিকুল ইসলাম ২৮ সেপ্টেম্বর প্রবেশ পাশ ইস্যু করেছেন। অথচ তার পাশ ইস্যু করার কোনো আইনগত এখতিয়ারই নেই। এদিকে প্রধানমন্ত্রী  তার মন্ত্রিসভায় কোনো উপমন্ত্রী নিয়োগ দেননি। অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) জাহাঙ্গীর আলম ২৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে প্রবেশ পাশ ইস্যু করেছেন উপমন্ত্রীর পিএসের নামে। প্রবেশ পাশের নিচে পদবি লেখা রয়েছে উপমন্ত্রীর পিএস।

গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে জাতীয় সংসদ-সদস্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে সংসদ-সদস্য এবং তার একান্ত সচিবের (পিএস) নামে পাশ থাকলেও তারা যখন সচিবালয়ে প্রবেশ করেন তখন গাড়ির ভেতরে ৬-৭ জনকে নিয়ে ঢোকেন। সচিবালয়ে প্রবেশ করে ওই গাড়ি আবার বাইরে পাঠান এবং ওই গাড়ি ভর্তি করে আবারও সচিবালয়ে প্রবেশ করে। পুলিশ সদস্যরা যাছাই করতে চাইলে তাদের ধমক দিয়ে কথা বলেন। সচিবালয়ে বিভিন্ন ভবনের লিফট ব্যবহারে তারা কোনো নিয়ম মানেন না। ঠেলাঠেলি করে লিফটে উঠেন। এতে অনেকে আগে থেকে লিফটের জন্য লাইনে দাঁড়ানো ব্যক্তি আর উঠতে পারেন না।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সচিবালয়ে নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রবেশ পাশ বিক্রির তথ্য স্থান পেয়েছে। কিছু কর্মকর্তা সব সরকারের সময়ই এ কাজ করে। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকরা তাদের কাছ থেকে পাশ ক্রয় করে সচিবালয়ে অবাধে প্রবেশ করে থাকেন। সচিবালয়ে প্রবেশে জাতীয় প্রেস ক্লাবের উলটোদিকের গেট সাংবাদিকদের সুবিধার জন্য তৈরি করা হলেও সচরাচর সাংবাদিকদের ওই গেট দিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। বয়স্ক, অসুস্থ সাংবাদিকদের বৃষ্টির মধ্যে মেইন গেট দিয়ে প্রবেশ করতে বাধ্য করেন পুলিশ সদস্যরা। অথচ সচিবালয়ের দালালরা বিনা পাশে ওই গেট দিয়ে প্রবেশ করছে অহরহ।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বিগত ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন আন্দোলনের কিছু ছাত্রনেতাকেও সচিবালয়ে অবাধে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের জন্য কোনো পাশের প্রয়োজন হয় না। পুলিশ সদস্যরা তাদের সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছেন।

  • Related Posts

    জীবন ও সময় যেভাবে বরকতময় হয়

    সময় আল্লাহ তাআলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। যে ব্যক্তি সময়ের মূল্য বোঝে না, সে প্রকৃত অর্থেই ক্ষতিগ্রস্ত। সময় থেকে বরকত শুধু সেই ব্যক্তির জীবন থেকেই উঠে যায়, যে এর অপচয় করে।…

    দিনে কত কাপ চা পান নিরাপদ?

    সকালে ঘুম থেকে উঠেই এক কাপ চা, কাজের ফাঁকে আরেক কাপ, বিকেলে বিস্কুটের সঙ্গে আরও এক কাপ—এভাবে দিনে কখন যে তিন-চার কাপ চা হয়ে যায়, অনেকেই তা খেয়াল করেন না।…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    জীবন ও সময় যেভাবে বরকতময় হয়

    জীবন ও সময় যেভাবে বরকতময় হয়

    দিনে কত কাপ চা পান নিরাপদ?

    দিনে কত কাপ চা পান নিরাপদ?

    ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের পরবর্তী পরিকল্পনা কী

    ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের পরবর্তী পরিকল্পনা কী

    বলিউড অভিনেতা দিনো মোরিয়া গ্রেফতার

    বলিউড অভিনেতা দিনো মোরিয়া গ্রেফতার

    রায়পুরে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজির দামে নৈরাজ্য

    রায়পুরে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজির দামে নৈরাজ্য

    পাকিস্তানকে হারিয়ে দারুণ জয় বাংলাদেশের

    পাকিস্তানকে হারিয়ে দারুণ জয় বাংলাদেশের