ভিটামিন সি প্রতিদিন সেবন করলে রক্তের অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি ধীর হয় না। তবে নতুন এক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এটি শরীরে প্রদাহজনিত কিছু পরিবর্তনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি গুরুতর কিছু জটিলতা কমার এবং রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাব্য সুবিধারও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
গবেষণার ফলাফল অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির পিয়ার-রিভিউড জার্নাল ক্যানসার-এ। এটি ছিল দ্বিতীয় ধাপের (ফেজ ২) ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল।
রক্তের ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে পরীক্ষা
ভিটামিন সি নিয়ে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের ১০৯ জনকে নিয়ে এই গবেষণা করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের সবারই এমন কোনো রক্তজনিত সমস্যা ছিল, যা পরবর্তী সময়ে ক্যানসারে রূপ নিতে পারে, অথবা তাদের রক্তের ক্যানসারের প্রাথমিক ও কম ঝুঁকির ধরন ছিল।
গবেষণার শুরুতে ৫৫ জনকে প্রতিদিন ১ হাজার মিলিগ্রাম ভিটামিন সি খাওয়ানো হয়। অন্য ৫৪ জনকে দেওয়া হয় প্লাসিবো। ১২ মাস ধরে চলা এই গবেষণাটি ছিল র্যান্ডমাইজড, ডাবল-ব্লাইন্ড ও প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত।
গবেষকদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভিটামিন সি রক্তের অস্বাভাবিক বা ক্যানসারপ্রবণ কোষের বৃদ্ধির হার কমাতে পারে কি না, তা দেখা। তবে এ ক্ষেত্রে ভিটামিন সি গ্রহণকারী ও প্লাসিবো গ্রহণকারী দুই দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
তবে অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা গেছে। ভিটামিন সি গ্রহণকারীদের শরীরে প্রদাহজনিত সংকেতের এমন কিছু পরিবর্তন দেখা যায়, যা তুলনামূলক ভালো ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষকেরা মনে করেন।
এ ছাড়া ভিটামিন সি গ্রহণকারী দলে রক্তস্বল্পতা, নিউমোনিয়া, তীব্র অ্যাসেপটিক আর্থ্রাইটিস এবং শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণের ঘটনা কম ছিল। তবে এই দলের মধ্যে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল বা পরিপাকতন্ত্রের সমস্যার হার বেশি দেখা গেছে।
বেঁচে থাকার ক্ষেত্রেও মিলেছে সম্ভাবনার ইঙ্গিত
গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের গড়ে ৩৩ দশমিক ৬ মাস, অর্থাৎ প্রায় তিন বছর পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই সময়ে মোট ৩৫ জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে ২৪ জন ছিলেন প্লাসিবো গ্রহণকারী এবং ১১ জন ভিটামিন সি গ্রহণকারী।
গবেষকদের একটি অনুসন্ধানমূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্লাসিবো গ্রহণকারীদের তুলনায় ভিটামিন সি গ্রহণকারীদের পর্যবেক্ষণকালীন সময়ে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি ছিল।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি ছিল অনুসন্ধানমূলক ফলাফল। তাই এ তথ্যের ভিত্তিতে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও বড় পরিসরের ফেজ ৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।
গবেষণার সহ-জ্যেষ্ঠ লেখক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান অ্যান্ডেল ইনস্টিটিউটের পিটার এ. জোনস বলেন, ‘এভিটা ট্রায়ালের ফলাফল নির্দিষ্ট কিছু প্রাক-ক্যানসার বা প্রাথমিক পর্যায়ের রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ভিটামিন সি কীভাবে এবং কতটা উপকারী হতে পারে, তা নিয়ে আরও গবেষণার শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে।’
তিনি বলেন, এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে গবেষকেরা সতর্ক আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে এসব ফলাফল লিউকেমিয়ার বিকাশ ঠেকানোর কৌশল তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।
এখনই চিকিৎসায় ভিটামিন সি ব্যবহারের সুপারিশ নয়
গবেষকেরা জানিয়েছেন, ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও এগুলো এখনই নতুন কোনো চিকিৎসা সুপারিশ করার মতো যথেষ্ট নয়।
গবেষণার আরেক সহ-জ্যেষ্ঠ লেখক এবং ডেনমার্কের রিগসহসপিটালেট, কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের চিকিৎসক ক্রিস্টেন গ্রোনবেক বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ের এসব রক্তজনিত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের জন্য গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে কী অর্থ বহন করতে পারে, তা নিয়ে তারা আশাবাদী।
তবে তিনি বলেন, গবেষণার বর্তমান ফলাফলের ভিত্তিতে এখনই কোনো সুপারিশ করার সময় আসেনি। আরও বড় একটি গবেষণার মাধ্যমে এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করছেন।
ভিটামিন সি কোষের ভেতরের টিইটি নামের কিছু এনজাইমের কার্যক্রম বাড়াতে পারে। এসব এনজাইম নির্দিষ্ট কিছু জিন সক্রিয় থাকবে নাকি নিষ্ক্রিয় থাকবে, তা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কিছু রক্তের ক্যানসারে টিইটি এনজাইমের কার্যক্রম কমে যাওয়াকে সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যায়। এ কারণেই রক্তের ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভিটামিন সি কোনো উপকার করতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষকদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সূত্র: দ্যা সাইন্স ডেইলি






