মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার গতি কমাতে এবং স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাভাবনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মস্তিষ্কের কোষীয় ক্ষয় কমাতে সহায়তা করতে পারে বিশেষ এক ধরনের খাদ্যাভ্যাস। ‘মাইন্ড ডায়েট’ অনুসরণকারীদের মস্তিষ্কে ধূসর পদার্থের ক্ষয় তুলনামূলক কম হয়। দীর্ঘমেয়াদি এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার গতি প্রায় আড়াই বছর ধীর হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
সম্প্রতি জার্নাল অব নিউরোলজি, নিউরোসার্জারি অ্যান্ড সাইকিয়াট্রি সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য প্রকাশ করেছে বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সায়েন্সডেইলি।
কী এই মাইন্ড ডায়েট
মাইন্ড ডায়েট হলো ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাস এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক খাদ্যতালিকার সমন্বয়ে তৈরি একটি পদ্ধতি। এর মূল লক্ষ্য মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখা এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে স্নায়বিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করা।
এই খাদ্যতালিকায় শাকপাতা, অন্যান্য সবজি, বেরি জাতীয় ফল, বাদাম, পূর্ণ শস্য, মাছ, ডাল, জলপাইয়ের তেল ও মুরগির মাংসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিপরীতে মাখন, মার্জারিন, পনির, লাল মাংস, মিষ্টি, পেস্ট্রি ও ভাজাপোড়া ফাস্ট ফুড সীমিত খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
১২ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ
গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রেমিংহাম হার্ট স্টাডির ১ হাজার ৬৪৭ জন মধ্যবয়সী ও বয়স্ক ব্যক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করেন গবেষকেরা। গবেষণার শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিল ৬০ বছর। অংশগ্রহণকারীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় প্রতি চার থেকে আট বছর পরপর। ১৯৯৯ সাল থেকে তাদের মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যানও করা হয়, যার মধ্যবর্তী সময় ছিল দুই থেকে ছয় বছর। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে খাদ্যাভ্যাসের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রত্যেকের অন্তত দুটি এমআরআই স্ক্যানের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গড়ে ১২ বছর পর্যবেক্ষণের সময় গবেষকেরা দেখেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের মোট আয়তন, ধূসর ও সাদা পদার্থ এবং স্মৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিপোক্যাম্পাসের আয়তন কমেছে। একই সময়ে মস্তিষ্কের ভেতরে তরলপূর্ণ প্রকোষ্ঠের আয়তন বেড়েছে।
তবে যারা মাইন্ড ডায়েট বেশি অনুসরণ করেছেন, তাদের মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থের ক্ষয় তুলনামূলক ধীর ছিল।
ধূসর পদার্থের ক্ষয় ২০ শতাংশ কম
গবেষণায় দেখা গেছে, মাইন্ড ডায়েটের স্কোর প্রতি তিন পয়েন্ট বাড়ার সঙ্গে বছরে ধূসর পদার্থের ক্ষয় ০.২৭৯ ঘন সেন্টিমিটার কম হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এটি বয়সজনিত ক্ষয় প্রায় ২০ শতাংশ কম হওয়ার সমতুল্য। মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার গতি প্রায় আড়াই বছর ধীর হওয়ার সঙ্গেও এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া মাইন্ড ডায়েটের স্কোর প্রতি তিন পয়েন্ট বাড়লে মস্তিষ্কের তরলপূর্ণ প্রকোষ্ঠের সম্প্রসারণের গতিও কম ছিল। এই পরিবর্তন প্রায় এক বছর বয়সজনিত মস্তিষ্কের ক্ষয় বিলম্বিত হওয়ার সমতুল্য বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
বেরি ও মুরগির মাংস
গবেষণায় কয়েকটি নির্দিষ্ট খাবারের সঙ্গে মস্তিষ্কের কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বেরি জাতীয় ফল বেশি খাওয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠের আয়তন বৃদ্ধির গতি কম হওয়ার সম্পর্ক দেখা গেছে। মুরগির মাংস খাওয়ার সঙ্গেও প্রকোষ্ঠের সম্প্রসারণ ধীর হওয়া এবং ধূসর পদার্থের ক্ষয় কম হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, বেরি জাতীয় ফলে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সহায়তা করতে পারে। মুরগির মাংসের মতো উচ্চমানের প্রোটিনের উৎসও স্নায়ুকোষের ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, বেশি মিষ্টি খাওয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠের আয়তন দ্রুত বৃদ্ধি এবং হিপোক্যাম্পাসের বেশি ক্ষয়ের সম্পর্ক দেখা গেছে। ভাজাপোড়া ফাস্ট ফুড খাওয়ার সঙ্গেও হিপোক্যাম্পাসের আয়তন বেশি কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে সব খাবারের ক্ষেত্রে ফলাফল প্রত্যাশিত ছিল না। পূর্ণ শস্য বেশি খাওয়ার সঙ্গে ধূসর পদার্থ ও হিপোক্যাম্পাসের দ্রুত ক্ষয় এবং মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠের আয়তন বৃদ্ধির সম্পর্ক দেখা গেছে। বিপরীতে, পনির খাওয়ার সঙ্গে ধূসর পদার্থ ও হিপোক্যাম্পাসের ক্ষয় কম হওয়া এবং মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠের আয়তন কম হারে বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রভাব বেশি
গবেষণায় মাইন্ড ডায়েটের সঙ্গে মস্তিষ্কের কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্পর্ক বয়স্ক অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী ছিল। যারা নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করতেন এবং যাদের অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা ছিল না, তাদের মধ্যেও এ সম্পর্ক বেশি দেখা গেছে।
গবেষকদের মতে, মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য উপযোগী খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি শারীরিক সক্রিয়তাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এসব অভ্যাস বয়সজনিত স্নায়বিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি কমানোর কৌশলে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা
গবেষণাটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক হওয়ায় মাইন্ড ডায়েট সরাসরি মস্তিষ্কের ক্ষয় ধীর করে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের খাদ্যাভ্যাসের তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, ফলে স্মৃতিনির্ভর তথ্য দেওয়ার কারণে ভুলের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া জিনগত ঝুঁকি ও সময়ের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের প্রভাব পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায়নি। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই শ্বেতাঙ্গ হওয়ায় অন্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ক্ষেত্রেও একই ফল প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত নয়।
তারপরও গবেষকদের মতে, মাইন্ড ডায়েট বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের অবক্ষয় ধীর করার সম্ভাবনাময় খাদ্যাভ্যাস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।







