মঙ্গলের বুকে একসময় তরল পানির অস্তিত্ব ছিল—এমন ধারণার পক্ষে নতুন প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সাহারা মরুভূমির মালিতে পাওয়া একটি উল্কাপিণ্ডের রাসায়নিক বিশ্লেষণে মিলেছে ৪১০ কোটিরও বেশি বছর আগে মঙ্গলের পৃষ্ঠে পানির উপস্থিতির ইঙ্গিত। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি পৃথিবীতে পাওয়া মঙ্গলের সবচেয়ে প্রাচীন উল্কাপিণ্ড হতে পারে।
২০২২ সালে মালির বির চালি গ্রামের কাছের সাহারা মরুভূমি থেকে আটটি খণ্ডে উল্কাপিণ্ডটি উদ্ধার করা হয়। এর সবচেয়ে বড় খণ্ডটি প্রায় মানুষের মুষ্টির সমান। তেঘাজা ০০১ নামের এই উল্কাপিণ্ডটির বয়স অন্তত ৪১০ কোটি বছর বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গ্রহবিজ্ঞানী ইয়াং লিউ বলেন, উল্কাপিণ্ডটি এমন এক সময়ের সাক্ষী, যখন মঙ্গল গ্রহ সম্ভবত বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ ও আর্দ্র ছিল।
পাথরের গঠনেই পানির প্রমাণ
তেঘাজা ০০১ মূলত গ্যাব্রো শ্রেণির একটি আগ্নেয় শিলা। এর প্রধান খনিজ উপাদান ফেল্ডস্পার ও পাইরোক্সিন। এতে ইউরেনিয়ামযুক্ত জিরকন স্ফটিকও পাওয়া গেছে। ইউরেনিয়াম সময়ের সঙ্গে সিসায় রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে শিলাটির বয়স নির্ধারণ করেছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, মঙ্গলের ভূগর্ভে ম্যাগমা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধার সময় শিলাটির সঙ্গে পানির রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটেছিল। অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের বিভিন্ন আইসোটোপ বিশ্লেষণেও পাওয়া গেছে পানির উপস্থিতির প্রমাণ।
বিজ্ঞানীদের মতে, পানি মঙ্গলের উপরিভাগ থেকে নিচের ভূত্বকে প্রবেশ করেছিল এবং ভূগর্ভের গলিত শিলার সঙ্গে মিশেছিল। পৃথিবীতেও এ ধরনের প্রক্রিয়া দেখা যায়।
প্রাণের উপযোগী ছিল প্রাচীন মঙ্গল?
বর্তমানে মঙ্গল গ্রহ শীতল, শুষ্ক ও প্রাণের জন্য প্রতিকূল। তবে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে, কয়েক শ কোটি বছর আগে সেখানে নদী, হ্রদ এমনকি উত্তর গোলার্ধে বিশাল সমুদ্রও ছিল।
গবেষণার সহলেখক ও নাসার অ্যামস রিসার্চ সেন্টারের গ্রহবিজ্ঞানী লি স্যাপার বলেন, তেঘাজা ০০১-এর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন মঙ্গলে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদান ও পরিস্থিতি থাকতে পারে। তবে সেখানে সত্যিই প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কিনা, এই গবেষণা তা নিশ্চিত করে না।
গবেষকদের ধারণা, মঙ্গলের ঘন বায়ুমণ্ডল ও উষ্ণ পরিবেশ একসময় সেখানে প্রাণের বসবাসের উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। তবে গ্রহটির প্রথম ১০০ কোটি বছরের মধ্যেই এসব অনুকূল পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। একপর্যায়ে মঙ্গল পরিণত হয় বর্তমানের শুষ্ক ও প্রাণের জন্য প্রতিকূল গ্রহে।
মঙ্গলের ইতিহাস জানার বিরল সুযোগ
এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে মঙ্গল গ্রহ থেকে আসা ৪৩৫টি উল্কাপিণ্ড শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র তিনটির বয়স মঙ্গলের প্রাচীন ইতিহাসের সময়কালের। ১৯৮৪ সালে অ্যান্টার্কটিকায় পাওয়া আরেকটি উল্কাপিণ্ডের বয়স প্রথমে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর নির্ধারণ করা হলেও সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে সেটির বয়স তেঘাজা ০০১-এর কাছাকাছি বলে জানা গেছে। নতুন গবেষণা অনুযায়ী, তেঘাজা ০০১ সম্ভবত দুটির মধ্যে বেশি প্রাচীন।
গবেষকদের ধারণা, উল্কাপিণ্ডটি মঙ্গলের দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চভূমি থেকে এসেছে। এর সম্ভাব্য উৎসস্থল হেলাস বেসিনের আশপাশ, যা মঙ্গলের অন্যতম বৃহৎ আঘাতজনিত খাদ।
নাসার বিজ্ঞানী ইয়াং লিউ বলেন, মঙ্গল থেকে পাওয়া উল্কাপিণ্ডগুলোই পৃথিবীতে থাকা মঙ্গলের একমাত্র সরাসরি নমুনা। এসব নমুনা বিশ্লেষণ করে মঙ্গলের প্রাথমিক গঠন, অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন এবং প্রাণের উপযোগী পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পাশাপাশি উপগ্রহ, ল্যান্ডার ও রোভারের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যও যাচাই করা সম্ভব হয়।
মহাকাশ পেরিয়ে সাহারায়
তেঘাজা ০০১-এর পৃথিবীতে আসার ঘটনাও বেশ নাটকীয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মঙ্গলের পৃষ্ঠে কোনো গ্রহাণুর আঘাতে শিলাটি মহাকাশে ছিটকে পড়ে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একসময় পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করে। এরপর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে উল্কাপিণ্ড হিসেবে সাহারা মরুভূমিতে পতিত হয়।
তবে ঠিক কবে এটি পৃথিবীতে এসে পড়েছিল, তা এখনো জানা যায়নি।
সূত্র: সামা টিভি






