তেহরানের সঙ্গে চলা অস্থিরতার মধ্যেও আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে যোগদানের জন্য ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভিসার অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা জাতিসংঘের বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য ইরানের ‘মূল প্রতিনিধিদল’ এবং প্রয়োজনীয় কর্মীদের ভিসার অনুমোদন দিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যারা ভিসা সংক্রান্ত গোপনীয়তা আইনের কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন। এই মূল প্রতিনিধিদলের মধ্যে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এই পদক্ষেপটি বেশ অস্বাভাবিক, কারণ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে সংঘাত চলছে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া বা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার টেবিলে ফেরার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।
এছাড়া ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি অবকাঠামো এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা জোরদার করেছে। লোহিত সাগর এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক পথ, যেখানে বিভিন্ন বাধার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। পাশাপাশি ওয়াশিংটনের মতে ইরান এখনও বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদে রাষ্ট্রীয় মদতদানকারী প্রধান দেশ হিসেবে বিবেচিত। যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের ‘গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক উৎস বা লাইফলাইন’ বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে একটি নতুন অভিযান শুরু করেছে।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরের স্বাগতিক দেশ হিসেবে সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে আসা বিদেশি নেতাদের বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা সাধারণত সীমিত। তবে অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত নেতাদের ভিসা প্রত্যাখ্যান বা তাদের আবেদনের বিষয়ে নিরুৎসাহিত করার নজির রয়েছে।
গত বছরের বিশ্বনেতাদের জাতিসংঘের বৈঠকের সময়ও ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পররাষ্ট্র দপ্তর ইরানি কূটনীতিকদের জন্য সীমিত সংখ্যক ভিসার অনুমোদন দিয়েছিল এবং প্রতিনিধিদলের চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। এসব বিধিনিষেধের মধ্যে ছিল নিউইয়র্ক শহরে জাতিসংঘের মিশন থেকে ইরানি কর্মকর্তাদের কতদূর পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি রয়েছে তার ওপর কড়াকড়ি এবং ‘কস্টকো’ ও ‘স্যামস ক্লাব’-এর মতো পাইকারি মেম্বারশিপ স্টোরগুলোতে কেনাকাটা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা।
ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও তার প্রতিনিধিদলকে সাধারণ পরিষদে আসার জন্য ভিসা দিতে পররাষ্ট্র দপ্তর অস্বীকৃতি জানানোর ঠিক একদিন পরেই ইরানি কর্মকর্তাদের ভিসার বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হলো। স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, স্বাগতিক দেশ হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধতা মেনে, ইরানি সরকারের মূল প্রতিনিধিদলটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চ-পর্যায়ের সপ্তাহে যোগ দিতে পারবে।
তবে আমাদের নীতি অনুযায়ী এই প্রতিনিধিদলের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ থাকবে এবং বিলাসবহুল ও অন্যান্য পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। গত বছরের তুলনায় এবারের প্রতিনিধিদলটি আকারে ছোট। স্টেট ডিপার্টমেন্ট ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (যারা ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিছু অংশের প্রশাসন পরিচালনা করে) বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। তাদের মতে, এই কর্তৃপক্ষ গাজায় চলমান ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধকে ‘আন্তর্জাতিকীকরণের’ চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা দায়ের এবং ইসরায়েলিদের ওপর হামলার দায়ে দেশটির কারাগারে বন্দী ব্যক্তিদের ভাতা প্রদান অব্যাহত রাখার মাধ্যমে তারা এমনটা করছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে এবং ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ ও শান্তির সম্ভাবনার জন্য প্রকৃত হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা দীর্ঘ সময় ধরে থমকে থাকা আলোচনার প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করলেও, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আদালতের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
কর্তৃপক্ষের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও বিধিনিষেধ আরোপ শান্তি প্রতিষ্ঠা বা সহিংসতা দমনে কোনো ভূমিকা রাখে না। বরং এ ধরনের পদক্ষেপ রাজনৈতিক সমাধানের পথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ফিলিস্তিনি অংশীদারকে দুর্বল করে এবং এমন সব শক্তিকে উৎসাহিত করে যারা দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান নস্যাৎ করতে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দখলদারিত্ব, বসতি স্থাপন ও ভূখণ্ড সংযুক্তির বাস্তবতা চাপিয়ে দিতে চায়।
যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্রের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। তবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন তাদের স্বীকৃতি দিয়ে থাকে।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।







